বাংলা বাজারে খেলতে-খেলতে ওরাও বাঙালি
রেখেছো বাঙালি করে মানুষ করোনি— এমন একটা আক্ষেপ হয়তো অনেকের মধ্যে আজীবন থেকে যাবে আন্ডার কারেন্টের মত । আবার কেউ কেউ আমরা এই বাঙালিয়ানাকেই মূলধন করে অনন্তকাল ‘বনগাঁয়ের শিয়ালরাজা’ হয়ে থেকে যাব। কোনটা ভালো? এ নিয়ে তর্ক চলুক। তবে এটা কিন্তু মানতেই হবে যে, ভারতের বাজারে এই বাঙালিয়ানা একটা বিরাট জায়গা দখল করে আছে। অর্থনৈতিক ভাবে পশ্চিমবঙ্গ হয়তো ভারতের ‘সবচেয়ে বড়লোক’ রাজ্য হিসেবে প্রথম তিনেও আসবে না। কিন্তু সাংস্কৃতিক দিক থেকে এ বাংলা বরাবরই কার্যত লিড করে এসেছে আসমুদ্রহিমাচলকে। গান-সিনেমা, নাটক-খাবার, সাহিত্য-উৎসব কিংবা বৌদ্ধিক চর্চায় বাংলার নিজস্ব একটা সাংস্কৃতিক পরিচয় রয়েছে একেবারে গোড়া থেকে। বাঙালি উপভোক্তাকে টার্গেট করতে গিয়ে তাই বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়কেই নিজেদের মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজির অংশ করে তুলেছে নামজাদা সব জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ব্যান্ড। এখানে একটা কথা গল্প হলেও সত্যি যে, সে সব ব্র্যান্ড গত কয়েক দশকে ঝানু গোয়েন্দার মতো করে বাঙালিয়ানা তথা বাংলার সংস্কৃতিকে পাকড়াও করেছে, তাদের অধিকাংশই বাংলার বাইরের ব্র্যান্ড। আবাঙালি ব্র্যান্ড, আবার ভীষণ রকম বাঙালিও। আসলে একটা বিষয় তাদের হাড়ে-হাড়ে বুঝতে পেরেছে যে বাংলায় কিছু বেচতে হলে স্রেফ বিজ্ঞাপনই যথেষ্ট নয়, বাঙালির আবেগ-কেই মূলধন করতে হবে।

তুমিও হেঁটে দেখো কলকাতা
মুম্বই মানে, স্বপ্নের শহর। সেখানে রুপোলি স্বপ্ন দেখায় বলিউড। ক্ষমতার শহর দিল্লিতেও নাকি টাকা ওড়ে। তবে কলকাতা মানে বরাবরই স্মৃতির শহর, নস্টালজিয়ার শহর এবং অতি অবশ্যই সংস্কৃতির শহর। আবার বণিকের মানদণ্ড কী ভাবে রাজদণ্ডের চেহারা নেয়, তা-ও কিন্তু খুব কাছ থেকে দেখেছে কলকাতা। বাংলার রাজধানী কলকাতায় মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি ঠিক করতে গিয়ে তাই খুব বেশি বেগ পেতে হয়নি দুঁদে মার্কেট প্লেয়ারদের। তাদের বিজ্ঞাপনে তাই বারবার ঘুরেফিরে এসেছে কলকাতার ট্রাম, হাতে টানা রিকশা, কফি হাউসের গুলতানি, কলেজ স্ট্রিটের বইপাড়া, হলুদ ট্যাক্সি, ঝমঝম বৃষ্টি, উত্তর কলকাতার সাবেক বনেদিয়ানা, আড্ডা এবং অতি অবশ্যই শারদীয়া। এ সব ছবি বা ফ্রেম স্রেফ দৃশ্যকল্প নয়, বাঙালির আজন্মলালিত আবেগের প্রতীক। আজ হয়তো বেলাইন হয়ে গিয়েছে ট্রাম, হলুদ ট্যাক্সি ধূসর হতে হতে উধাও, উত্তর কলকাতাও বুঝি সে ভাবে আঁকড়ে রাখতে পারেনি পুরোনো সব বাড়িগুলোকে। স্মৃতি গাঁথনিটুকু রয়ে গিয়েছে ভিতরে, বাইরে পুরসভা ডিসপ্লে বিপজ্জনক বাড়ি। অনেকখানি নষ্ট হয়ে গেলেও বারবার তবু কলকাতাকে আবিষ্কার করতে গিয়ে ব্যান্ডের জোব চার্নকরা আজও নস্টালজিয়াকেই পুঁজি করে।

সপ্তমীতে প্রথম দেখা…
‘এই প্রাণঢালা উৎসবে বারবার…’ বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজো এলেই ভাসতে থাকে বিজ্ঞাপনের এই সুরটা। শালিমার নারকেল তেলের এই ব্র্যান্ডটা অবশ্য নিপাট কলকাতার। তবে পিছিয়ে নেই বাকিরাও। গত প্রায় তিন দশক ধরে পশ্চিমবঙ্গ বিশেষত কলকাতা ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইমোশনাল মার্কেট হয়ে উঠেছে। শুনতে আশ্চর্য মনে হলেও বাঙালির সংস্কৃতি, আবেগ, আর নস্টালজিয়ার ভরকেন্দ্রে থাকা দুর্গাপুজোকে সবচেয়ে সুচারু ভাবে ব্যবহার করেছে যে সব ব্র্যান্ড, সেগুলির একটা বড় অংশের উৎসে কিন্তু সেই অর্থে কোনও বং-কানেকশন নেই। তা সত্ত্বেও কোকাকোলা, ক্যাডবেরি থেকে শুরু করে কেএফসি, সুইগি, পার্লের মতো ব্র্যান্ড সরাসরি পণ্য বেচার বদলে বাংলার সংস্কৃতি তথা পুজোর আবেগের অংশ হয়ে ওঠার উপরে বেশি জোর দিয়েছে। স্থানীয় ভাষা ও আবেগকে মূলধন করে তারা আসলে এমন একটা পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করে চলেছে, যেখানে মাছে-ভাতে বাঙালিকেও ভাবতে বাধ্য করা হয়েছে যে, ‘এই ব্র্যান্ড তো আমাদেরই।’ বিজ্ঞাপনী ভাষায় এই চার ফেলাকে বলা হয়, কালচারাল লোকালাইজেশন বা ইমোশনাল রিজিওনাল ব্র্যান্ডিং। বিশেষ করে তাই বাঙালির প্রিয় শারদীয়া পুজো আজ শুধুই ধর্মীয় উৎসব নয়, ভারতের অন্যতম সেরা কর্পোরেট মার্কেটিং সিজনেও পরিণত হয়েছে।

‘তাই এবার জমবে মজা’—
২০০৯-এ থামসআপের এই বিজ্ঞাপন যেমন। প্রায় বন্ধ হতে বসা পাড়ার পুজো নিউ জেনারেশনের কাঁধে ভর করেই ফের রঙিন হয়ে উঠছে– ভাঙন ধরা সময়ে দাঁড়িয়ে উত্তরণের এই গল্পটা আজও বাঙালির বড় আপন। কিংবা সেই কোকাকোলা-কাব্য — ‘সপ্তমীতে প্রথম দেখা, অষ্টমীতে হাসি/ নবমীতে বলতে চাওয়া, তোমায় ভালবাসি, দশমীতে হঠাৎ কেন আকুল হল প্রাণ/ প্রাণপ্রতিমা তুমি এ বার যাবে কি ভাসান…’ বিজ্ঞাপনেই ছিল স্লোগান, ‘যা ইচ্ছে তাই হোক, এ বার পুজোয় চাই কোক।’ কিংবা ধরুন হালের—‘কোকে ফুডে, পুজোর মুডে’ বা ‘কোকের সাথে রোজ, পুজোর মহাভোজ’। বলাই বাহল্য, কোনও বহুজাতিক সংস্থা যখন বাংলায় বিজ্ঞাপন দেয়, তখন গ্রাহক মনে করেন: এই ব্র্যান্ড আমাদের সংস্কৃতিকে সম্মান করছে। এই Cultural Acceptance Strategy-ও কিন্তু বহু অবাঙালি ব্র্যান্ডকে বাঙালি করে তুলেছে।

কিছু ভালো হোক, কিছু মিষ্টি হোক
ক্যাডবেরি, কেএফসি, ম্যাকডোমাল্ডসও পাক্কা খিলাড়ি। বাঙালি দর্শক সাধারণত ‘হার্ড সেলিং’ পছন্দ করে না– এই আঁতের কথাটা গোড়াতেই ধরে নিয়ে নরম আবেগের পথ বেছে নিয়েছে দাপুটে এ সব মার্কেট প্লেয়াররা। বাঙালির মনকাড়া বিজ্ঞাপন মানেই পাড়ার মানুষ, পরিবারের সম্পর্ক, পুরনো স্মৃতি কিংবা উৎসবের উষ্ণতা। সহজ এই সমীকরণটা ধরে ফেলেছে সুইগি, জ়োমাটোও। বাংলায় খাবার মানে যে শুধুমাত্র খাবার নয়, বরং আস্ত একটা সংস্কৃতি, তা বুঝেই নানাবিধ উৎসব অফার, বাংলায় সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট কিংবা লোকাল স্বাদের প্রচারে বারবার নিজেদের প্রাসঙ্গিক করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এই সব ফুড ডেলিভারি অ্যাপ।উদ্দেশ্য একটাই– আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডও যাতে লোকাল মনে হয়। বাংলা মিম থেকে শুরু করে কলকাতার খাবার, রাতের বিরিয়ানি থেকে বৃষ্টির দিনে খিচুড়ি– এসব নিয়ে ডিজিটাল কন্টেন্টও বাড়ছে ক্রমশ। তানিশক-এর মতো আবাঙালি ব্র্যান্ডও যেমন শাঁখা-পলা, লাল বেনারসি, ধুনুচি নাচ, ছাদনাতলা প্রভৃতি অনুষঙ্গের মাধ্যমে সেই কবেই বাংলার ঐতিহ্যের অংশ হয়ে উঠেছে।