পাায়ে পায়ে আনন্দ… বাঙালির পাদুকাপুরাণে ‘বস’ মাস্টারদার শিষ্যও
সালটা ১৯৬৫। দেশের স্বাধীনতা তখন ষোলোয় পা দিয়েছে। মুম্বইয়ের জুতোর দোকানে কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে স্বভূমিতে ফিরলেন সত্যপ্রসাদ রায় বর্মণ। এ বার নিজের একটা কিছু করতেই হবে। গোলামিতে আর ফিরতে চাননি তিনি। তাই কলকাতার চিৎপুরে নিলেন একটা ছোট্ট দোকান। নাম রাখা হলো, K.M. Khadim & Company। ‘বড়োবাবু’ র জুতোর দোকান। বিক্রিবাটা নেহাত মন্দ হচ্ছে না। বুকে অনেকখানি ভরসার বাতাস ভরে তাই ১৯৮১ থেকে হোলসেলে জুতো বেচা শুরু করলেন সত্যপ্রসাদ। তৈরি হলো S.N. Footwear Industries Private Limited। খদ্দেরের মনের সাথে জুতোর মান আর মাপ ও নকশা মিলিয়ে দেওয়াটাই পরবর্তী কয়েকদশক, মানে একেবারে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত হয়ে দাঁড়ালো সত্যপ্রসাদের ধ্যানজ্ঞান।

বেশ কয়েকবার বদলাল ব্যবসার স্ট্রাটেজিক ফুটওয়ার্ক। কিন্তু প্রোডাক্ট সেই জুতো। রিটেলে নামল খাদিম। লক্ষ্য গুণমানের সাথে আপস না-করে সেরা দামে সেরা পণ্য সরাসরি ক্রেতার হাতে তুলে দেওয়া। এর পরে আর পেছন ফিরে তাকানোর কোনো গল্প নেই। ১৯৯৭-৯৮ সালে কোম্পানির নাম পাল্টাল— Khadim’s Chain Store Private Limited। প্রাইভেট থেকে পরে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি। দেখতে দেখতে ২৩টা রাজ্য ও একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ৮৫৩ নিজস্ব আউটলেট! ব্রিটিশ ওয়াকার্স, ল্যাজ়ার্ড, সফ্টটাচ কিংবা লিয়ো-র মতো অন্তত ন’খানা সাব-ব্র্যান্ড। আর ৫০০ কোটির টার্ন ওভার। এক পা দু’পা করে এগিয়ে এভাবেই মহীরুহ হয়ে উঠল বাংলার নিজস্ব ব্র্যান্ড ‘খাদিম ইন্ডিয়া’। তা সে মার্কেটে যতই একশো বছরের পুরোনো সুইস ব্র্যান্ড বাটা থাকুক না কেন!


বেশ কয়েকবার বদলাল ব্যবসার স্ট্রাটেজিক ফুটওয়ার্ক। কিন্তু প্রোডাক্ট সেই জুতো। রিটেলে নামল খাদিম। লক্ষ্য গুণমানের সাথে আপস না-করে সেরা দামে সেরা পণ্য সরাসরি ক্রেতার হাতে তুলে দেওয়া। এর পরে আর পেছন ফিরে তাকানোর কোনো গল্প নেই। ১৯৯৭-৯৮ সালে কোম্পানির নাম পাল্টাল— Khadim’s Chain Store Private Limited। প্রাইভেট থেকে পরে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি। দেখতে দেখতে ২৩টা রাজ্য ও একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ৮৫৩ নিজস্ব আউটলেট! ব্রিটিশ ওয়াকার্স, ল্যাজ়ার্ড, সফ্টটাচ কিংবা লিয়ো-র মতো অন্তত ন’খানা সাব-ব্র্যান্ড। আর ৫০০ কোটির টার্ন ওভার। এক পা দু’পা করে এগিয়ে এভাবেই মহীরুহ হয়ে উঠল বাংলার নিজস্ব ব্র্যান্ড ‘খাদিম ইন্ডিয়া’। তা সে মার্কেটে যতই একশো বছরের পুরোনো সুইস ব্র্যান্ড বাটা থাকুক না কেন!

কিন্তু ওই যে কথায় বলে না, গেঁয়ো যোগী ভিখ পায় না! বাংলা-বিহার-ঝাড়খণ্ড-ওডিশার গণ্ডি পেরিয়ে সর্বভারতীয় ব্র্যান্ড হওয়ার লক্ষ্যে তাই ২০২০ থেকেই মোটামুটি মধ্য ভারত ও দক্ষিণে গুটি-গুটি পা ফেলতে শুরু করে দিয়েছে অজন্তা। এদের তৈরি চপ্পল পায়ে দেয়নি, এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া ভার। তবে এই অজন্তাই কিন্তু নানাবিধ আধুনিক জুতো এনে ইতিমধ্যেই সাধ্যের মধ্যে সাধপূরণের লোভটা ধরিয়ে দিয়েছে জনমানসে। এক্সক্লুসিভ অজন্তা স্টোর এখন ১৫০-র কাছাকাছি। তবে গোটা দেশে ছড়িয়ে রয়েছে সংস্থাটির হাজারখানেক ডিলার এবং ২০ হাজারেরও বেশি রিটেলার! আপাতত সংস্থার টার্গেট— ২০২৮-এর মধ্যে ব্যবসার অঙ্ক হাজার কোটি টাকা পার করা।
ওহ্, বলা হয়নি। অজন্তা কিন্তু ইতিমধ্যেই দেশের প্রথম এআই-পাওয়ার্ড স্মার্ট জুতো বাজারে এনে ফেলেছে। যে ইমপ্যাক্টো দিয়ে তাদের স্পোটর্স শু মার্কেটে পা রাখা, সেই ইমপ্যাক্টোই এনেছে নেভিগেটর! এই স্মার্ট পাদুকা স্টেপ ট্র্যাক করতে পারে। আবার ওয়ার্কআউটে ফাঁকি দিলেও দিব্যি ধরা পড়ে যাবেন। এই জুতোয় রয়েছে কুইক কল ডায়াল কিংবা পছন্দের কোনও মিউজ়িক অ্যাপ বা ওয়েবসাইটে যাওয়ার সোজা রাস্তাও!

কী ভাবছেন? অজন্তা-খাদিমের নাম জপতে গিয়ে শ্রীলেদার্সকেই ভুলে গেলাম? তা আবার হয় নাকি! পুজোয় হোক বা এমনি-এমনি, লিন্ডসে স্ট্রিট থেকে বগলদাবা করে সাদা-নীল ওই জুতোর বাক্স নিয়ে বাড়ি না ফেরা মানে যে ধর্মতলায় গিয়ে অধর্ম করে আসা। রামের এটা চাই, তো শ্যামের ওটা– মুখের কথা খসা মাত্রই শুরু স্টোরের সেলসম্যানদের গেরিলা যুদ্ধ। ‘মহাশূন্যের ওপার হতে’ স্টাইলে উড়ে এসে হাতে জুড়ে বসছে জুতো– দশকের পর দশক ধরে সার্কাসের খেলই দেখাচ্ছে শ্রীলেদার্স।

কবে থেকে? তা হলে তো অনেকখানি পিছনে হাঁটতে হয়। দেশ তখনও গোলামিতে আচ্ছন্ন। সময়টা ১৯৩০-এর এপ্রিল। ৬৫ জনকে নিয়ে একটা টিম বানালেন মাস্টারদা সূর্য সেন। তারপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন সেই রোমহর্ষক চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন আর জালালাবাদ পাহাড়ে ব্রিটিশ পুলিশের সঙ্গে যুদ্ধে। মাস্টারদার সেই দুর্ধর্ষ টিমেই ছিলেন বছর একুশের সুরেশ দে। পুলিশের গুলি হজম করে জেল-খাটা এই সুরেশই স্বাধীন ভারতে দেশভাগের পরে চলে আসেন জামশেদপুরে। কারও গোলামি করতে পারব না বাপু— এই ভাবনা থেকেই ১৯৫২-য় নেমে পড়লেন জুতোর ব্যবসায়। পুঁচকে সে দিনের ওই জুতোর দোকানটাই আজকের ঝাঁ চকচকে শ্রীলেদার্স বলতে পারেন। ঠিক ধরেছেন, বয়সের হিসেবে এই শ্রীলেদার্স আদতে খাদিমস-অজন্তারও বিগ ব্রাদার!

১৯৯০-এ প্রয়াত হন সুরেশ দে। ব্যবসার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন তাঁর তিন ছেলে। এঁদের মধ্যে দু’জন থেকে যান জামশেদপুরে। সত্যব্রত দে চলে আসেন কলকাতায়। তাঁরই হাত ধরে ১৯৮৬ সালে কলকাতার লিন্ডসে স্ট্রিটে মাত্র ১০০ বর্গফুটের একটা ছোট দোকান চালু হয়— ‘থ্রি লিন্ডসে’। বাঙালির সঙ্গে শ্রীলেদার্সের ডিরেক্ট কন্ট্যাক্ট সেই তখন থেকে। আজ তার ভারতজোড়া নাম। দেশের বাইরে জার্মানি, গ্রিস এবং কুয়েতেও ব্যবসা শুরু করেছে শ্রীলেদার্স। ডিলার আর রিটেলারের সংখ্যা ক্রমশ বেড়েই চলেছে। বার্ষিক টার্নওভারও ২০০ কোটি পার! প্রথম দিন থেকেই শ্রীলেদার্স তাদের প্রোডাক্টের গুণমান, কাস্টমার এবং ভেন্ডরদের উপরেই জোর দিয়েছে। নিয়ম করে প্রতি সপ্তাহে প্রোডাক্ট অর্ডার দেওয়া এবং তার পেমেন্ট করা ছিল বাধ্যতামূলক। সেই ট্র্যাডিশন এখনও চলছে।

গোড়ার ছবিটা কিন্তু মোটেই এতখানি জমকালো ছিল না ‘থ্রি লিন্ডসে’র। আট কিংবা নয়ের দশকে লিন্ডসে স্ট্রিট তখন নামী-দামি জুতোর ব্র্যান্ডে ছয়লাপ। বিশাল বিশাল তাদের দোকান, মারাত্মক সব ব্র্যান্ড পাওয়ার, বিপুল মার্কেটিং বাজেটের সঙ্গে আবার প্রভাবশালী যোগাযোগ! সেখানে ‘থ্রি লিন্ডসে’-র যিনি প্রতিষ্ঠাতা, তিনিই ঝাড়ুদার। এই হয়তো অ্যাকাউন্টস দেখছেন, তো পরক্ষণেই তিনি হয়ে গেলেন ইনভেন্টরি ম্যানেজার। ১০০ বর্গফুটের দোকানটাই তখন ঘরবাড়ি হয়ে উঠেছে সত্যব্রত দে-র। এক সেট জামা-কাপড়ই রোজ পরতেন। কখনও ভেজাও থাকত! এক টাকার খাবার খেতে রোজ হাঁটতেন এক মাইল করে। তবু জ়িরো-টু-হিরো হওয়ার স্বপ্ন দেখা থামেনি। জয় সত্যেরই।
আর পাঁচটা ব্র্যান্ড যখন জমকালো সব বিজ্ঞাপনে নিজেদের পরিচিতি বাড়াচ্ছিল সত্যব্রত কিন্তু তখনও মগ্ন স্রেফ পণ্যের গুণমান দিয়ে গ্রাহকের আস্থা অর্জনে। তিনি জানতেন, গ্রাহক সন্তুষ্ট হলে সে বার্তা রটে যাবেই ক্রমে! তা-ই হলো। ব্যবসা বাড়ল, দোকান বড় হলো, আর্থিক অবস্থারও উন্নতি হলো— কিন্তু সত্যব্রত দে-র ব্যক্তিগত জীবনযাপন প্রায় একই রয়ে গেল। থ্রি লিন্ডসে থেকে আজকের শ্রীলেদার্স— সারা দেশে ৫০টিরও বেশি শোরুম নিয়ে এখন ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় জুতোর ব্র্যান্ড। অথচ স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কাটা চলছে আজও। ধরাবাঁধা কোনও সুনির্দিষ্ট অ্যাড এজেন্সির সঙ্গে এরা কাজ করে না। শপিং মলে থাকে না এদের জুতো। ই-কমার্স কোনও সাইটের সঙ্গে কখনও গাঁটছড়া বাঁধেনি শ্রীলেদার্স। জাঁদরেল কোনও সেলিব্রিটিও এদের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর নয়। ‘শ্রীবৃব্ধি’ তবু অব্যাহতই।